বৃহস্পতিবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১০ ফাল্গুন ১৪৩০
 
মতামত
ফ্যাসিবাদ, নাজিবাদ, জায়নবাদ ও হিন্দুত্ব একই সুতোয় বাঁধা সঙ্ঘের দর্শন





পলাশ দাশ
Monday, 5 February, 2024
8:52 PM
 @palabadalnet

নরেন্দ্র মোদি। ফাইল ছবি

নরেন্দ্র মোদি। ফাইল ছবি

ভারতে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি তার ট্রাম্প কার্ড বের করে ফেলেছে মন্দির উদ্বোধনের মেগা ইভেন্টে। আরএসএস প্রচারক, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি,  মন্দির উদ্বোধনের ৩৬ মিনিটের বক্তৃতায় এযাবৎ ঠারেঠোরে বলা কথা একেবারে  স্পষ্ট করেছেন। 

প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় তার একসময়ের মন্ত্র, ‘আচ্ছে দিন’, ‘গ্লোবাল ইন্ডিয়া’, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, ‘স্টার্ট আপ ইন্ডিয়া’, ‘সব কা সাথ সবকা বিকাশ’ ইত্যাদির কোনো উল্লেখ ছিল না। নয়া মন্ত্র শুনিয়েছেন তড়িঘড়ি, অসম্পূর্ণ মন্দিরে শিশু রামের প্রতিষ্ঠার বিশাল সমারোহে- ‘দেশ সে দেব, রাম সে রাষ্ট্র’। 

রামের ওপর ভর করে বিজেপির উত্থান। বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিতে ভরসা সেই রাম। এবার নির্বাচন হবে ‘রাম রাজ্য’-র স্বপ্ন দেখিয়ে হিন্দুদের এককাট্টা করে। ১৯২৫ -এ সঙ্ঘের ১০০ বছর হতে চলেছে। সেই পথে চলার, সঙ্ঘীয় ভাবনার সরকারি ঘোষণা ‘অমৃত কাল যাত্রা’। যে পথের শেষে আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ভারতকে হত্যা করে সৃষ্টি করা হবে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’। 

হিন্দুত্ব ও হিন্দু ধর্ম এক নয়

প্রধানমন্ত্রী বললেন, ভারতীয় সংস্কৃতির কেন্দ্রে আছেন শ্রী রাম। রামময় ভারত - রামই ভারত, ভারতই রাম। বহু ধর্ম, ভাষা, জাতি-উপজাতি, সংস্কৃতির অস্তিত্বকে অস্বীকার করে সর্বক্ষেত্র সঙ্ঘের ভাবনা অনুযায়ী ‘এক’ ছাঁচে ঢেলে দেয়ার প্রচেষ্টা আরও প্রকাশ্য এলেঅ। বহু নয় এক। অথচ দেশটা রামময় নয়। কথায় আছে হিন্দুদের ৩৩ কোটি দেবতা, ধর্মীয় রীতি-প্রথা-দেবতা আলাদা আলাদা। সংস্কৃতি ধর্মে ধর্মে যেমন ভিন্নতা বহন করে আবার এক ধর্মের মধ্যেও তা বহু বৈচিত্রে ভরা। 

ভারতীয় সংস্কৃতির এই বহুত্ববাদও রামরাজ্যে দিতে হবে বলি। এক রাষ্ট্র, এক ধর্ম, এক ভাষা, এক সংস্কৃতি এসে দাঁড়াবে গণতন্ত্রহীন একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরাচারে। যার কেন্দ্রে থাকবে ব্রাহ্মণ্যবাদী, পুরুষতান্ত্রিক হিন্দুত্ববাদী শক্তি। আরএসএস’র সাম্প্রদায়িক, যুক্তিহীন, ধর্মান্ধ ও ফ্যাসিস্ট সুলভ  আদর্শটি হলো ‘হিন্দুত্ব’। ‘হিন্দুত্ব’-র সঙ্গে হিন্দু ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা সম্পূর্ণ  রাজনৈতিক প্রকল্প। 

সাভারকার ১৯২৩ সালে হিন্দুত্ব গ্রন্থে যে সংজ্ঞা দেন তা হলো যাদের জন্মভূমি, পুণ্যভূমি এই দেশ তারাই হিন্দু। বাকিরা, এ দেশে তাদের অধিকার নেই। থাকতে হলে তাদের ভারতীয় সংস্কৃতি মানে হিন্দুত্বকে মেনে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে থাকতে হবে। অথচ ভারতের সংবিধান তার সব নাগরিককে ধর্ম, বর্ণ, জাতি-উপজাতি, লিঙ্গ নির্বিশেষে সমান অধিকার দিয়েছে। ধর্ম ব্যক্তিগত পালনীয়, রাষ্ট্র দেখবে যাতে সবাই নিজ ধর্ম শান্তিতে, নির্বিঘ্নে পালন করতে পারে। 

ফ্যাসিবাদ, নাজিবাদের অনুগত ‘হিন্দুত্ব’ 

হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলি পরাধীন ভারতেও ছিল ফ্যাসিস্ট অনুগামী, মুসোলিনির নেতৃত্ব ও ফ্যাসিস্ট সংগঠন দেখে আরএসএস অনুরূপ সংগঠন গড়ে তুলতে উৎসাহিত হয়েছিল।  কিছু সময়ের মধ্যে হিটলারের প্রবল উত্থান ও সেমেটিক জাতি নিধনের প্রেক্ষিতে হিন্দুত্ববাদী নেতারা আবার নাজিবাদের প্রবল সমর্থক হয়ে উঠেছিল। 

আর্য রক্তের ‘পবিত্রতা’ রক্ষায় ‘সেমেটিক জাতি’ নির্মূল করার ভয়ঙ্কর অমানবিকতাকে হিন্দুত্ববাদী নেতারা বরণ করেছিলেন সম্ভ্রমের সঙ্গে। তারা উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন এবং মনে করতেন ভারতেও হিন্দুদের এই পবিত্রতা রক্ষায় মুসলিমদের প্রতি সেই আচরণই করা দরকার যা জার্মানরা ইহুদিদের ওপর করছে জার্মানিতে।  

হিন্দুত্ববাদীরা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ না নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশবাদকে সমর্থন করেছে একদিকে আর অন্যদিকে ব্যস্ত থেকেছে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা, বিভাজন, দাঙ্গা বাধানোর কাজে। ইহুদি নিধনকারী হিটলার প্রসঙ্গে আপ্লুত সাভারকার বলছেন, “হিটলার নাৎসি বলে তাকে নর-রাক্ষস ভাবার কারণ নেই, কিংবা চার্চিল নিজেকে গণতন্ত্রী হিসাবে দেখেন বলে তাকে একজন আধা ঈশ্বর বলার কোনো কারণ নেই। জার্মানি যে অবস্থার মধ্যে পড়েছে তাতে নাৎসিবাদ অনস্বীকার্যভাবে জার্মানির মুক্তিদাতা হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে।”

জওহরলাল নেহরু ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করলে, সাভারকার তাকে আক্রমণ করে বলেন, “অবশ্যই পণ্ডিত নেহরুর থেকে হিটলার ভালো জানেন জার্মানির পক্ষে কোনটা খাপ খায়।”

দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক এমএস গোলওয়ালকার তার বই ‘উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড’-এ লেখেন, “জার্মানদের জাতিত্বের গর্ব আজ মুখ্য আলোচনার বিষয় হয়ে পড়েছে। নিজেদের জাতীয় সংস্কৃতিকে কলুষমুক্ত করতে জার্মানি গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে সেমিটিক জাতি-ইহুদিদের দেশ থেকে বিতাড়ন করেছে। জাতিত্বের গর্ব এখানে তার সর্বোচ্চ মহিমায় প্রতিষ্ঠিত। জার্মানি এটাও প্রমাণ করেছে যে, নিজস্ব ভিন্ন শিকড় আছে এমন জাতি বা সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে একটি পূর্ণাঙ্গ সত্তা তৈরি করা অসম্ভব। এই শিক্ষা হিন্দুস্থানে আমাদের গ্রহণ করা এবং তার থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।”

এটাই হলো সঙ্ঘের দর্শন। সাভারকারই প্রথম বলেন হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতি এবং তারা একত্রে কখনোই থাকতে পারে না। 

জায়নবাদের ভক্ত ‘হিন্দুত্ব’

যে সাভারকার  ইহুদি গণহত্যাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, তিনিই ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদি রাষ্ট্র হওয়ায় আপ্লুত হয়ে বললেন, “এটা লক্ষ্য করে আমি আনন্দিত যে, বিশ্বের সামনের সারির দেশগুলির বিস্ময়কর সংখ্যাধিক্য সমর্থনে ইহুদি জনগণের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফিলিস্তিনে একটি স্বতন্ত্র ইহুদি রাষ্ট্র গঠিত হবে। এবং একে বাস্তবে ঘটিয়ে তুলতে সশস্ত্র সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী অবর্ণনীয় যন্ত্রণা, আত্মত্যাগ এবং সংগ্রামের পর ইহুদিরা খুব শিগগিরই ফিলিস্তিনে তাদের জাতীয় আশ্রয় ফিরে পাবে। সন্দেহাতীতভাবে এটি তাদের পিতৃভূমি এবং পবিত্রভূমি।”

ইসরাইল প্রতিষ্ঠা হওয়ার অনেক আগে, এমনকি ইউরোপে হিটলারের ইহুদি নিধনেরও আগে, ইহুদি রাষ্ট্র   প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে আদর্শের উদ্ভব হয়েছিল যা ‘জায়নিজম’ বা ‘জায়নবাদ’ নামে পরিচিত, সে সম্পর্কে, ১৯২৩ সালে সাভারকার তার  ‘হিন্দুত্ব’ নামক গ্রন্থে লিখেছিলেন, “যদি জায়নবাদীদের স্বপ্ন পূরণ হতো, যদি ফিলিস্তিন ইহুদিদের একটি রাষ্ট্র হতো, তবে আমরাও আমাদের ইহুদি বন্ধুদের মতো সমান খুশি হতাম।”

সাভারকার তার নিজস্ব  ভাবনার আশ্রয় যেমন খুঁজে পেয়েছিলেন ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের মধ্যে তেমনই  আরব দুনিয়ার ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ গঠনের মতাদর্শের প্রবক্তা থিওডর হার্জেল-র জায়নিজমেরও তিনি সমর্থক ছিলেন। হিন্দু আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও মুসলমান-খ্রিস্টানদের প্রতি বিদ্বেষের রসদ যেখানে যেখানে পাওয়া গেছে এদেশের হিন্দুত্ববাদীরা সেইসব আদর্শকেই বুকে আঁকড়ে ধরেছে, ঘৃণায় অন্তরকে পূর্ণ করেছে, হিংস্রতার নখ-দাঁতকে ধারালো করেছে। 

জায়নিজমের অনুগামী মোদি সরকার 

সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশ থেকে মুক্তির সংগ্রামের দায়বদ্ধতা থেকেই ভারত চিরকাল ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের পক্ষে থেকেছে। বৃটিশ সরকারের ফিলিস্তিনে ইহুদি জাতীয় আবাস গড়ার ব্যালফোর ঘোষণার বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন দাঁড়িয়েছিল। 

গান্ধীজী ১৯৩৮ সালে হরিজন পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখেন, “আমার সমস্ত সহানুভূতিই রয়েছে ইহুদিদের প্রতি।… বন্ধুত্বের গন্ডি পেরিয়ে ইহুদিদের প্রতি আমার সহানুভূতির পিছনে ছিল এই সাধারণ সর্বজনীন বিচারবুদ্ধি। কিন্তু আমার এই সহানুভূতি আমাকে ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তা থেকে অন্ধ করেনি। ইংল্যান্ড যেমন ইংলিশদের, ফ্রান্স যেমন ফরাসিদের, ফিলিস্তিনও সেভাবে আরবদের। সে কারণে আরবদের উপরে ইহুদিদের চাপিয়ে দেওয়াটা ভুল ও অমানবিক। ফিলিস্তিনে যা চলছে তাকে কোনোরকম নৈতিক আচরণবিধি দ্বারা বৈধতা দেওয়া যায় না’। 

স্বাধীন ভারত প্রথম থেকে ফিলিস্তিনের পাশে থেকেছে, অবশ্যই উপনিবেশবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে থেকেছে।

ফিলিস্তিনের পাশ থেকে মোদির ভারত সরে উপনিবেশবাদী ইসরাইলের পাশে দাঁড়ায় যাতে সম্রাজ্যবাদী আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হওয়া যায়। হামাসের আক্রমণকে ঢাল করে ফিলিস্তিনি নিকেশ যখন গণহত্যার রূপ নেয়, তখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশ জাতিসংঘের যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবের পক্ষে মত দিলেও ভারত নারী-শিশুঘাতী ইসরাইলের পক্ষে দাঁড়ায়। শুধু ব্যবসায়িক, প্রতিরক্ষার বিষয় নয় হিন্দুত্ব ও জায়নবাদের আদর্শগত সাদৃশ্যই এই নেক্সাসের অন্যতম কারণ। ভারত দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ যারা গণহত্যাকারী ইসরাইলকে সমর্থন করছে।

হিন্দুত্ব ও জায়নিজম- রাজনৈতিক প্রকল্প

‘হিন্দুত্ব’ এবং ‘জায়নিজম’ দুটিই ধর্মকে ভিত্তি ও ব্যবহার করে গড়ে তোলা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রকল্প। যার সঙ্গে ‘হিন্দু ধর্ম’ ও ‘জুডাইজম’ বা ইহুদি ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। হিন্দুত্ববাদীরা মনে করে ভারতের যা কিছু সবই হিন্দুদের এবং এই দেশ হিন্দুদের আর ইহুদিরা মনে করে সমগ্র ফিলিস্তিন ইহুদিদের - ‘ল্যান্ড অব ইসরাইল’। 

হিন্দুত্বের প্রবক্তাদের মতে, বিধর্মীরা হিন্দুদের পবিত্র সব স্থান ধ্বংস করেছে বা অধিকার করেছে, অপবিত্র করেছে। যদি বিধর্মীরা হিন্দুত্বকে গ্রহণ করে এবং অধিকারহীনভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে থাকতে চায় তবে তারা ভারতে থাকতে পারে নতুবা এ দেশ থেকে তাদের চলে যেতে হবে। জায়নিস্টরা মনে করে সমগ্র ফিলিস্তিন হলো ইহুদিদের, কিছু আরব বা অন্যান্যরা এখানে থাকলে অধিকারহীনভাবেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়েই তাদের থাকতে হবে। 

১৯৪৭ থেকে ইসরাইল ক্রমাগত তার বর্ডারের সম্প্রসারণ ঘটিয়ে চলেছে, প্যালেস্তিনীয়রা তাদের জমি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে দেশ ছাড়ছে বা অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। নাকবায় সাড়ে ৭ লাখ ফিলিস্তিনি আরব বিতাড়িত হয়ে ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক, গাজা সহ পৃথিবীর নানা দেশে উদ্বাস্তু শিবিরে বংশ পরম্পরায় আজ বাস করতে বাধ্য হচ্ছে। যারা ইসরাইলে আছে তাদের অধিকাংশের সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক জীবনে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় উৎসাহিত ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা। 

হিন্দুত্ববাদীরা যে হিন্দুরাষ্ট্রের কথা ভাবে তা মুসলমান ও খ্রিস্টান বিবর্জিত। শিখ, বৌদ্ধ, জৈন এখানে থাকবে নিজ ধর্মীয় পরিচিতির উর্ধ্বে, বৃহত্তর হিন্দু সমাজের অংশ হিসাবে। এই ভাবনার প্রতিফলন ঘটে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব প্রদানের জন্য বিজেপি সরকারের আনা আইন সিএএ এবং এনপিআর, এনআরসি প্রয়োগের সিদ্ধান্তে। একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষকে বাদ দেয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। 

হিন্দুত্ববাদীরা মনোযোগী ছাত্রের মতো  এক্সক্লুসনের পাঠ নিয়েছে ইহুদি জায়নিস্টদের কাছ থেকে। অত্যাচারের ছাপ পড়েছে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ কাশ্মিরে, তারা তাদের রাজ্যের মর্যাদা এখনও ফেরত পায়নি। ৩৭০ রদের পর থেকে আজও জনজীবন স্বাভাবিক হয়নি। ইসরাইল ফিলিস্তিনের ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে বর্ণবিদ্বেষী সেপারেশন ওয়াল তুলে ফিলিস্তিনিদের আলাদা করে রেখেছে, চেক পোস্ট বসিয়ে গতিবিধি নিয়ন্ত্রিত করেছে, সেই শিক্ষা মোদি সরকার প্রয়োগ করছে কাশ্মিরে সংখ্যালঘুদের ওপর। 

হিন্দুত্ববাদীরা তাদের কাজ ও লক্ষ্য পূরণে, ঈশ্বরের নির্দেশের কথা বলে থাকেন। রামের জন্মস্থান উদ্ধারে ৫০০ বছরের প্রাচীন সৌধ বাবরি মসজিদ ভেঙে সেখানেই নির্মিত হলো রাম মন্দির। উগ্র  জায়নিস্টদের ভাবনাতেও আছে ঈশ্বরের নির্দেশ। বাইবেলের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আব্রাহামের ভূমিতে ল্যান্ড অব ইসরাইল যতক্ষণ না প্রতিষ্ঠা হচ্ছে ততক্ষণ ইসরাইল থামবে না। হিন্দুত্ববাদীরা বাবরি মসজিদ ভাঙার পর স্লোগান দেয়, ‘ইয়ে তো পহেলি ঝাঁকি হ্যায়, কাশি মথুরা বাকি হ্যায়।’ তাদের তালিকায় আছে কাশি, মথুরা, জ্ঞানবাপী সহ অজস্র মসজিদ। 

রেলওয়ে স্টেশন, এলাকার নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে যাতে কোথাও বিধর্মী চিহ্ন না থাকে।  ইসরাইল দেখিয়েছে বোমায় কিভাবে ধ্বংস করে দেওয়া যায় ফিলিস্তিন চিহ্ন, ফিলিস্তিন ও ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বকে ক্রমাগত আস্বীকার করার মধ্যে তাদের অধিকারের প্রশ্নকে কিভাবে নস্যাৎ করে দেয়া যায়। এমনকি অলিভ গাছ যার সঙ্গে যুক্ত আছে ফিলিস্তিনিদের জীবনযাপন, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতি, সেই অলিভ ধ্বংসের লাগাতার প্রচেষ্টার পেছনেও আছে ফিলিস্তিনীয় অস্তিত্বকে মুছে ফেলার চেষ্টা। 

জায়নবাদীরা মনে করে একের পর এক যুদ্ধে ইসরাইলের জয়ের পেছনে আছে ঈশ্বরের আশীর্বাদ। জেরুজালেম ৩টি ধর্মের পবিত্র স্থান হলেও আজ জেরুজালেম, ইসরাইলের দখলে। ফিলিস্তিন সম্পূর্ণ দখল করে নেয়ার পেছনেও নাকি ঈশ্বরের সমর্থন আছে, ঠিক তেমন বাবরি ধ্বংসের পেছনে ঈশ্বরের নির্দেশ এবং প্রাণ প্রতিষ্ঠায় ঈশ্বর বেছেছেন মোদিকে! 

জাতিসংঘ চেয়েছিল জেরুজালেম থাকবে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু আগ্রাসী, একটি ধর্মের চরম আধিপত্য কায়েম করতে ইসরাইল সব আন্তর্জাতিক আইন ও সিদ্ধান্তকে ফুৎকারে উড়িয়ে কায়েম করেছে তাদের দখল। আল-আকসা মসজিদে যাওয়ার পথে তারা নির্মাণ করেছে ধাতব প্রাচীর। ভারতে হিন্দুত্ববাদীরা এই পথই যেন অনুসরণ করছে।

অভিন্ন শত্রু

হিন্দুত্ব ও জায়নিজম, হিন্দুত্ববাদী ও জায়নিস্টদের আদর্শগত, লক্ষ্যগত সাদৃশ্যের মূলে আছে দুই মতাদর্শের সাধারণ এক শত্রুর উপস্থিতি। মুসলিম বিদ্বেষ থেকেই 'হিন্দুত্ব’, জায়নিজমের ভক্ত হয়েছে। সাভারকার জায়নিজমের  সমর্থক ছিলেন কিংবা অধিকৃত ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করার পক্ষপাতী ছিলেন শুধু তাই নয়, তিনি মনে করতেন হিন্দু ও ইহুদিরা উভয়েই মুসলমানদের দ্বারা অতীতে অত্যাচারিত হয়েছে যার প্রতিকার দরকার। 

ইসরাইল ফিলিস্তিনকে সম্পূর্ণ গ্রাস করতে চাইছে তাদের হত্যা করে, পরিবেশকে বসবাসের অযোগ্য করে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করে। আজকের হিন্দুত্ববাদীদের কাছে ইসরাইলের যুদ্ধ, তাদের যুদ্ধ। কারণ তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়ছে এবং মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী। হিন্দুত্ববাদীরা এমনটাই ভারতে করতে চায়। ইসরাইলকে তারা আক্রান্ত হিসাবে তুলে ধরতে সোশাল মিডিয়ায় মিথ্যা ছবি, ভিডিও ছড়াচ্ছে, ইসলামোফোবিয়া সৃষ্টি করতে। ইসরাইলের হয়ে জনমত গঠন যা ভারতের অভ্যন্তরে হিন্দু-মুসলমান বিভাজন আরো বাড়াতে পারে, তার জন্য সরব হয়েছে সংবাদ মাধ্যম। 

ভারত রক্ষায় শামিল হোন 

সাম্প্রদায়িক ঘৃণা, বিদ্বেষের আবহে মন্দির উদ্বোধন এবং রাম রাজ্যের ঘোষণা উৎসাহিত করেছে ধর্মান্ধ, হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে, আশঙ্কিত করেছে সংখ্যালঘু সহ ধর্মনিরপেক্ষ মানুষকে। যাদের সংবিধানকে রক্ষা করার কথা, তারাই সংবিধান ও দেশের আদর্শকে মুছে ফেলে, দেশকে নিয়ে যেতে চাইছে আজ থেকে ৭০০/৮০০ বছর আগের পৃথিবীতে যেখানে যুক্তি, বিজ্ঞান, প্রগতিশীলতা, আধুনিকতার বিপরীতমুখে যুক্তিহীন, ধর্মান্ধতা, অন্ধবিশ্বাস, প্রশ্নহীন আনুগত্যের, আধিপত্যের রাজত্ব তৈরি হবে। 

আজ যারা শুধুমাত্র মনের গভীরে থাকা ধর্মীয় বিদ্বেষের জোয়ারে ভাসছেন অথবা ধর্মীয় আধিপত্যের শ্লাঘায় আবেগতাড়িত হচ্ছেন, কাল তাকেও হারাতে হবে সব অধিকার। দারিদ্র, বেকারি সহ বেঁচে থাকার নির্মম যন্ত্রণার প্রতিকার, প্রতিবাদটুকুও বহুকালের জন্য হারিয়ে ফেলবেন। নিজের একান্ত সোশাল প্রোফাইলেও সব মনের কথা বলতে পারবেন না। আমরা নিশ্চিত আপনি সব স্বাধীনতা হারাতে চাইবেন না। তাই বিকৃত রাজনৈতিক অভিসন্ধি থেকে সৃষ্ট ফ্যাসিবাদ, নাজিবাদ ও জায়নবাদ সদৃশ হিন্দুত্ব আর হিন্দুত্ববাদী বিকৃতির হাত থেকে বহুধা সংস্কৃতির ভারতকে রক্ষার সংগ্রামে আপনার সামর্থ্য মতো এগিয়ে আসুন।

সূত্র: গণশক্তি


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2024
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]