বৃহস্পতিবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১০ ফাল্গুন ১৪৩০
 
শিল্প-সাহিত্য
জীবনানন্দ দাশের কবিতার নায়িকারা





আবু আফজাল সালেহ
Sunday, 22 October, 2023
4:36 PM
 @palabadalnet

জীবনানন্দ দাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯ - ২২ অক্টোবর ১৯৫৪

জীবনানন্দ দাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯ - ২২ অক্টোবর ১৯৫৪

‘আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন/ আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন’, ‘সুরঞ্জনা, ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি/ বোলোনাকো কথা ঐ যুবকের সাথে/ ফিরে এসো সুরঞ্জনা/নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে’ (আকাশনীলা/ সাতটি তারার তিমির) জীবনানন্দ দাশের অমর কবিতা। 

বনলতা সেন তো বাংলাসাহিত্যের সর্বোচ্চ পঠিত/জনপ্রিয় কবিতা। বনলতা সেন যেন শুধু জীবনানন্দ দাশের মানস নয়, যেন আমারই প্রেমিকা। বনলতা সেন, সুরঞ্জনা অতি পরিচিত নাম। আর এ পরিচিতির প্রধান অবদান জীবনানন্দ দাশ। এছাড়া শেফালিকা বোস, শ্যামলী, সবিতা, অরুণিমা স্যানাল, সরোজিনী, সুচেতনা, মৃণালিনী ঘোষাল, শঙ্খমালা, চন্দ্রমালা, মানিকমালা প্রমুখ নারীর নাম রয়েছে তার কবিতায়। 

এসব নাম নিয়ে নারী সংকেত নিয়ে রয়েছে বিভিন্ন প্রসঙ্গ। 

‘বনলতা সেন’ যেন আমাদের মোনালিসা। ভিঞ্চির মোনালিসা সুন্দর দৃশ্য আমাদের মুগ্ধ করে; তেমিনই জীবনানন্দের বনলতা সেন বাঙালির মানসপটে এক অপূর্ব নায়িকার চিত্রকল্প সৃষ্টি করে। পার্থক্য মোনালিসা চিত্রকর্ম- শরীরী আর বনলতা সেন অশরীরী। কিন্তু দুজনের প্রতিই পাঠক-স্রোতার প্রবল আগ্রহ, দুর্নিবার আকর্ষণ। জীবনানন্দের মতো আমরাও আশ্রয় ও প্রশ্রয় খুঁজি বনলতা সেনের মধ্যেই- ‘দুদণ্ড শান্তি’ খুঁজি তার মধ্যেই। 

‘আকাশনীলা’ চরিত্রও বাঙালির মনের আরেকটি আগ্রহের বিষয়। বাঙালির মানসপটে ও বাহ্যিক প্রভাব বনলতা সেনের কাছাকাছি না হলেও বেশি দূরের নয়। আকাশনীলার হৃদয় যেন ঘাস। শঙ্খমালা কিশোরী- কবির অকালপ্রয়াত নায়িকা। শঙ্খমালার প্রসঙ্গ এসেছে একাধিক কবিতায়। ‘করুণ শঙ্খের মতো স্তন‘ বা ‘কড়ির মতো শাদা মুখ’ তার। কান্তারের পথ ছেড়ে এসে কবি শঙ্খমালাকে বলে ‘তোমারে চাই’। 

জীবনানন্দের বোধে প্রেম, প্রকৃতি ও মানুষ মিলেমিশে একাকার হয়েছে। হয়ত প্লেটনিক প্রেমে নয় বরং দেহজ প্রেমে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। বনলতা সেন এবং শঙ্খমালার পাশাপাশি ‘দুদর্শনা’ নায়িকার উপস্থাপনাও এমনই বলে। সুদর্শনার প্রসঙ্গও একাধিকবার এসেছে। প্রাকৃতিক প্রেমের আশ্রয়েও আধুনিক নাগরিক জীবনের অনুষঙ্গ সুদর্শনা। সুরঞ্জনা প্রেম ও অপ্রেমের দ্বন্দ্ব নিয়ে হাজির হয়েছে জীবনানন্দের কবিতায়। সুরঞ্জনা যেন ‘মানুষের তরে এক মানুষীর গভীর হৃদয়’। 

জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ব্যবহৃত নারী চরিত্রসমূহ বিচিত্র চরিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ‘মনে পড়ে কবেকার পাড়াগাঁর অরুণিমা সান্যালের মুখ’ (বুনো হাঁস/বনলতা সেন), ‘এইখানে মৃণালিনী ঘোষালের শব/ভাসিতেছে চিরদিন : নীল লাল রুপালি নীরব’ (শব/মহাপৃথিবী) পঙক্তির মতো কিছু স্থানে প্রেমিকার নামের সঙ্গে পদবি যোগ (সেন, স্যানাল, ঘোষাল) করে আরো বাস্তব ও জীবন্ত করেছেন। 

আবার ক্ষেত্রমতে, ভৌগোলিক স্থান (নাটরের বনলতা সেন) যুক্ত করেছেন। জীবনানন্দের কাছে মুক্তির আশ্রয় তিনটি- প্রকৃতি, প্রেম এবং অতীতের রহস্যময় সৌন্দর্যের জগৎ। 

উল্লিখিত নায়িকাদের প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু পঙক্তি তুলে ধরা যাক। 

১. ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা ...সব পাখি ঘরে আসে- সব নদী ফুরায় এজীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’ (বনলতা সেন) 

২. ‘শ্যামলী, তোমার মুখ সেকালের শক্তির মতন : যখন জাহাজে চড়ে যুবকের দল ...তোমার মুখের দিকে তাকালে এখনো আমি সেই পৃথিবীর সমুদ্রে নীল, দুপুরের শূন্য সব বন্দরের ব্যথা, বিকেলের উপকণ্ঠে সাগরের চিল, নক্ষত্র, রাত্রির জল যুবাদের ক্রন্দন সব শ্যামলী, করেছি অনুভব।’ (শ্যামলী/বনলতা সেন) 

৩. ‘সুচেতনা, তুমি এক দূরতর দ্বীপ বিকেলের নক্ষত্রের কাছে; সেইখানে দারুচিনি-বনানীর ফাঁকে নির্জনতা আছে।’ (সুচেতনা/বনলতা সেন) 

৪. ‘বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত তোমার দুই চোখ খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি কুয়াশার পাখনায় জোনাকির দেহ হতে খুঁজেতেছি তোমারে সেইখানে চিতা জ্বলে : দখিন শিয়রে মাথা শঙ্খমালা যেন পুড়ে যায় স্তন তার করুণ শঙ্খের মতো দুধে আর্দ্র কবেকার শঙ্খিনীমালার! এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর’ (শঙ্খমালা/বনলতা সেন) 

৫. ‘একদিন স্মাল হেসে আমি তোমার কাছে এক মহিলার কাছে শুনেছি কিন্নরকণ্ঠ দেবদারু গাছে, দেখেছি অমৃতসূর্য আছ। এই পৃথিবীর ভালো পরিচিত রোদের মতন তোমার শরীর’ (সুদর্শনা/বনলতা সেন) 

৬. ‘সুরঞ্জনা, আজও তুমি আমাদের পৃথিবীতে আছ বয়স বেড়েছে ঢের নরনারীদের ঈষৎ নিভেছে সূর্য নক্ষত্রের আলো; তবুও সমুদ্র নীল; ঝিনুকের গায়ে আলপনা’ (সুরঞ্জনা/বনলতা সেন) 

৭. ‘সরোজিনী চলে গেল অতদূর? সিঁড়ি ছাড়া পাখিদের মতো পাখা বিনা? জাফরান আলোকের বিশুষ্কতা সন্ধ্যার আকাশে আছে লেগে; লুপ্ত বেড়ালের মতো; শূন্য চাতুরীর মূঢ় হাসি নিয়ে জেগে‘ (সপ্তক/সাতটি তারার তিমির)

 ৮. ‘সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে’ (সুচেতনা/বনলতা সেন)

জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন ‘মাস্টার পিস‘ চরিত্র। বাংলায় সবচেয়ে পঠিত একটি চরিত্র বনলতা সেন। জীবনানন্দ দাশের কল্যাণেই ক্লাসিক মর্যাদা ও তুমুল জনপ্রিয় হয়েছে বনলতা সেন চরিত্র। ভিঞ্চির মোনালিসার মতো জীবনানন্দের মানসকন্যা হচ্ছে বনলতা। বনলতা সেন থেকে আকাশনীলা, সুরঞ্জনা হয়ে শঙ্খমালা মনের মাধুরী দিয়ে নায়িকাদের উপস্থাপন করেছেন জীবনানন্দ দাশ। সময়ের অস্থিরতা, প্রেম-অপ্রেমের জটিলতার মধ্যেই বিকশিত হয়েছে জীবনানন্দ দাশের কবিতার নায়িকারা, নারীরা। কখনো সুরঞ্জনা, কখনো সবিতা বা সুদর্শনা কখনো নামোল্লেখ না করেই জীবনান্দের নায়িকারা বিকশিত হয়েছে।


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2024
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]